ব্যাংকিং বার্তা

ব্যাংক কেন ঋণের সুদ মওকুফ করতে চায় না!

সুদ মওকুফ কি?

সাধারণত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মালামাল অন্যান্য জামানত নদী ভাঙ্গন, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পুড়ে গেলে, ঋণ গ্রহীতার মৃত্যু হলে অথবা ব্যাংকের পাওনার ছেড়ে সম্পত্তির মূল্য কম হলে সুদ মওকুফের জন্য বিবেচিত হয়।

ব্যাংকের ঋণ যখন আটকে যায় তখন ব্যাংকারের শত চেষ্টা থাকে ব্যাংকের আসল ঋণটা সুদমুনাফাসহ আদায় করতে। চলে  আলাপআলোচনা।  আলাপ আলোচনায় প্রায় সব ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা একটি শর্ত জুড়ে দেন। আর তা হলো সুদ মওকুফ।গ্রাহক মনে করেন ব্যাংকার সহযোগিতা করতে চাইলেই সুদ মওকুফ হয়ে যায় ব্যাংকের মুনাফায় আঘাত আসে বলে ব্যাংকার সুদ মওকুফ করতে চান না। তবে পরিচালনা পর্যদ চাইলেই সুদ মওকুফ করতে পারে। ব্যাংক যে সুদ মওকুফ করে নাতা নয়।তবে ঋণের অবস্থার ওপর তা অনেকটা নির্ভর করে।

 কখন সুদ মওকুফ হওয়ার উপর্যুক্ত হয়?

একেক পর্যায়ে একেক ধরনের বিবেচনা সামনে চলে আসে যেমন গ্রাহকের মৃত্যুসিকিউরিটিবিহীন ঋণঅপর্যাপ্ত সিকিউরিটির  ঋণদীর্ঘদিন ধরে শ্রেণীকৃতদীর্ঘদিনের মামলাধীনবারবার চেষ্টার পরও নিলামে সিকিউরিটি বিক্রিতে ক্রেতার অভাবত্রুটিপূর্ণ  ডকুমেন্টেশন ইত্যাদি।কিন্তু কোন পর্যায়ে কতটুকু সুদ মওকুফ করা যাবে তার কোনো বিধিবিধান বর্তমানে প্রচলিত নেই। 

আইনে কি আছে?

ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ১৯৯১এর ধারা-৪৯ ()তে বলা হয়েছে ‘ঋণ শৃঙ্খলার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণভাবে সব ব্যাংক কোম্পানি বা কোনো বিশেষ ব্যাংক কোম্পানি বা বিশেষ শ্রেণীর ব্যাংক কোম্পানির জন্য ঋণ শ্রেণীকরণ  সঞ্চিতি সংরক্ষণঋণ মওকুফপুনঃতফসিলীকরণ কিংবা পুনর্গঠনসংক্রান্ত বিষয়গুলোয় বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয় নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।

ওই বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯১ সালের ৭ অক্টোবর বি সি ডি পরিপত্রমূলে নির্দেশ প্রদান করে যে প্রতিটা ব্যাংক  তাদের নিজস্ব নীতিমালার মধ্যে সুদ মওকুফ করতে পারবেতবে আসল (প্রিন্সিপালমওকুফ করা যাবে না।

 বিধানমূলে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন মোতাবেক সুদ মওকুফ করে আসছে। ২০১৭ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংক একাই ১ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করেছিল। ২০২০ সালে বেসরকারি  ব্যাংক গুলো ১ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করে।

ব্যাংকের সুদ মওকুফ ব্যাংকের জন্য ক্ষতিকর কেন জেনে নিই

সুদ মওকুফের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে প্রায় ঋণগ্রহীতা সুদ মওকুফ পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। যিনি সুদ দিতে পারবেন,  তিনিও একটি আবেদন ছেড়ে দেন। কারণ সুদ মওকুফ পাওয়ার মানদণ্ড বিষয়ে ধারণাটা যেখানে ব্যাংকারদের মধ্যেই অস্পষ্টসেখানে গ্রাহকদের কাছে মওকুফের প্রাপ্যতা সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা নয়।

কোনো কোনো ব্যাংক শ্রেণীকৃত ঋণের কিংবা মামলাধীন ঋণের স্থগিত সুদের অর্ধেক মওকুফ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্থগিত  সুদের পুরোটাই মওকুফ করে। কিছু ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় আয় খাতে আকলিত সুদও মওকুফ করলেও বেশির ভাগ ব্যাংক  পারতপক্ষে তা করে না।অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক জামানতের (কোল্যাটারেল সিকিউরিটিবাজারমূল্য ঋণের পরিমাণের চেয়ে বেশি হলে সেক্ষেত্রে গ্রাহক দের সুদ মওকুফ সুবিধা দেয়া হয় না। উচ্চ আদালতে ‘রিটএর কারণে ব্যাংকের মামলা যদি বেশ কয়েক বছর ধরে নিষ্পত্তি না হয়শেষ পর্যন্ত গ্রাহক যদি সুদ মওকুফ করলে আসল দিতে রাজি হয়তখন ব্যাংকের কাছে ব্যাংকারকে দেয়া কষ্টের কথা অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর যে গ্রাহক নানা প্রতিকূলতার কারণে ঋণ শোধ করতে পারেন না  কিন্তু ব্যাংকের ঋণ শোধে তার আন্তরিকতা আছে বলে  প্রতীয়মান হয়সেক্ষেত্রে ব্যাংকার তাকে সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়ে দায় থেকে রেহাই দেন।

সুদ বা মুনাফা মওকুফের ব্যাপারে ব্যাংকাররাই শুধু নিয়মকানুনের অভাব বোধ করছেন তা নয়গ্রাহকরাও জানতে চান কে সুদ  মওকুফ পাওয়ার যোগ্য আর কে যোগ্য নন। 

 ইচ্ছাকৃত খেলাপির সৃষ্টি কেন হয়?

অনেক ঋণগ্রাহক মনে করেন কেউ কেউ যখন সুদ মওকুফ সুবিধা পেয়েছেনসুতরাং তারাও কোনো এক সময়  সুবিধা পাবেন। এটা মনে করে ঋণ পরিশোধ করেন না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। ইচ্ছাকৃত খেলাপির সৃষ্টি হয়।

খারাপ ঋণগ্রহীতা যদি সুদ মওকুফ পেয়ে বাজারে তার ক্ষমতা  সক্ষমতার বাণী আওড়ায়তখন ভালো ঋণগ্রহীতারা কোনো  ধরনের সুদ রেয়াদ সুবিধা ভোগ না করে কিংবা না পেয়ে ব্যাংকের নীতিনৈতিকতা চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।এর মূল কারণ সুদ মওকুফের নির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকা।

আবার বড় খেলাপিরা বেশি সুদ মওকুফ সুবিধা পান। ক্ষুদ্র  মাঝারি গ্রাহকরা  সুবিধা প্রাপ্তি থেকে অনেক দূরে থাকেনকারণ বড় গ্রাহকদের কু বুদ্ধি দেওয়ার জন্য দামী আইনি লোক ভাড়ায় পাওয়া যায়।এ প্রক্রিয়ার একটি বড় ফল হলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি।

সুদ মওকুফ শুধু ব্যাংকের জন্য ক্ষতি নয় সরকার  রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়

  • এটা সর্বজনবিদিত যে ব্যাংকের সুদ মওকুফ সুবিধা প্রদান করা হলে ব্যাংকের নিট আয় কমে যায়।
  • ফলে আমানতকারীদের সুদ  আয় কমে যায়ডিভিডেন্ড কম হয় 
  • সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

আবার কিছু ছাড় দিয়ে যদি ব্যাংকের বড় স্বার্থ রক্ষা  করা যায়তা ব্যাংকের জন্য লাভজনক। 

তাই ঋণের সুদ মওকুফের একটি নীতিমালা থাকা কাম্য। কে  সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা রাখেনকে রাখেন নাতা জানা  ব্যাংকারের জন্য যেমন জরুরিগ্রাহকের জন্যও তেমনি অত্যাবশ্যক। 

আর কেউ যদি সুদ মুনাফা মওকুফ সুবিধাপ্রাপ্ত হনতিনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পুনর্বার ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা  হারানোর বিধান রাখা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

তথ্য সুত্র : ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ বিধান আরও পড়ুন: গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা কোথায় পাবেন